|
ধর্মগ্রন্থ ছুঁয়ে শপথের ভিডিও পাঠালে দলে ভেড়াত সাজ্জাদ
নতুন বার্তা, চট্টগ্রাম:
|
চট্টগ্রামে শিল্পপতির বাসা লক্ষ্য করে ভারী অস্ত্র দিয়ে গুলিবর্ষণের ঘটনায় শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খানের তিন সহযোগীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গুলিবর্ষণকালে ব্যবহৃত একটি এসএমজি (সাবমেশিনগান), একটি বিদেশি রিভলভার, পিস্তল ও বেশকিছু গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। একই সঙ্গে গ্রেফতারদের কাছ থেকে একটি ভিডিও ক্লিপ উদ্ধার করা হয়েছে। ভিডিওটির বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে, সাজ্জাদ আলী খানের দলে ভিড়তে হলে পবিত্র ধর্মগ্রন্থ ছুঁয়ে শপথ করতে হয়। সেই শপথবাক্যের ভিডিও ক্লিপ বিদেশে পলাতক সাজ্জাদের কাছে পাঠানোর পর সে অনুমোদন দেয়। এরপর থেকেই তার সহযোগী হিসাবে কাজ করতে পারে। অন্যথায় নয়। বর্তমানে সাজ্জাদের গ্যাংয়ে ২০ থেকে ২২ জন সন্ত্রাসী রয়েছে। যাদের সবাই ‘ভয়ংকর’। প্রকাশ্য দিবালোকে মানুষের সামনে মানুষ খুন করতে তারা কুণ্ঠাবোধ করে না। একে-৪৭ রাইফেল, এসএমজির মতো ভারী অস্ত্র রয়েছে তাদের ভান্ডারে।এদিকে চট্টগ্রামে শিল্পপতি মুস্তাফিজুর রহমান ও মুজিবুর রহমানের বাসায় প্রকাশ্যে মুহুর্মুহু গুলিবর্ষণের সঙ্গে সরাসরি জড়িত তিন সন্ত্রাসী গ্রেফতার এবং তাদের কাছ থেকে অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনাকে সিএমপির বড় ধরনের সাফল্য হিসাবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। ৫ আগস্টের পর নগর থেকে উত্তর জেলাজুড়ে একের পর এক খুনখারাবি, চাঁদাবাজিতে প্রশাসনকে অস্থির করে রাখে সাজ্জাদ বাহিনী। বিদেশে বসে থেকেও নিজের সন্ত্রাসীদের দিয়ে এভাবে খুন ও চাঁদাবাজি করানোর ঘটনায় সিএমপি এবং জেলা পুলিশও বিব্রত ছিল। সিএমপি কমিশনার হাসিব আজিজ বলেছেন, সন্ত্রাসীদের বিষয়ে কোনো আপস নেই। যারা সাধারণ মানুষের ঘুম হারাম করতে চায়, তাদের ঘুম হারাম করবে পুলিশ। শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদের তিন সহযোগী গ্রেফতার ও এসএমজিসহ শিল্পপতির বাসায় গুলিবর্ষণে ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধারকে তাদের চলমান ‘অপরাশেন এস-ড্রাইভের’ বড় ধরনের সাফল্য বলে মনে করেন তিনি। সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) ওয়াহিদুল হক চৌধুরী শিল্পপতির বাসায় গুলির ঘটনায় গ্রেফতারদের নাম জানান। মঙ্গলবার রাতে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি অভিযানের বিস্তারিত বর্ণনা দেন। গ্রেফতার তিনজন হচ্ছে-কাইয়ুম চৌধুরী ওরফে রিমন, মনির ও সায়েম। তাদের বুধবার আদালতে তোলার পর ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়। আদালত তিনজনেরই ৭ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। অভিযানের বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার ওয়াহিদুল হক চৌধুরী বলেন, প্রথমে গোপন তথ্যের ভিত্তিতে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী মোহাম্মদ আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী ওরফে রিমনকে গ্রেফতার করা হয়। তার স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে চকবাজার থানা এলাকা থেকে একটি থ্রি টু বোরের বিদেশি রিভলবার ও ৯ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার রিভলবার ও গুলি সিএমপির পাহাড়তলী থানা থেকে লুট করা হয়েছিল মর্মে নিশ্চিত হওয়া গেছে। কাইয়ুম চৌধুরী আলোচিত বহদ্দারহাটে সংঘটিত চাঞ্চল্যকর ৮ হত্যা মামলার যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি এবং শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগী। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ডিসির (উত্তর) নেতৃত্বে অপর একটি দল সোমবার পাঁচলাইশ থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে একটি ব্রাজিলিয়ান টরাস নাইন এমএম পিস্তল ও একটি মোটরসাইকেলসহ মনির নামে একজনকে গ্রেফতার করে। উদ্ধার করা বিদেশি পিস্তলটি সিএমপির ডবলমুরিং থানা থেকে লুট করা হয়েছিল বলে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে। পরে আসামি মনিরের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মঙ্গলবার বায়েজিদ বোস্তামী থানা এলাকা থেকে তার সহযোগী সায়েমকে গ্রেফতার করা হয়। সায়েমের স্বীকারোক্তি ও দেখানো স্থান থেকে (খুলশী থানা এলাকা) একটি এসএমজি, ২টি ম্যাগাজিন ও ৫০ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। এই অস্ত্র ও গুলি খাগড়াছড়ির পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে তারা কিনেছে বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে। মনির ও সায়েমের বিরুদ্ধে খুন, ডাকাতি, চাঁদাবাজি ও অস্ত্র আইনে ১০টি মামলা রয়েছে। শিল্পপতির বাসায় মুহুর্মুহু গুলি করার ঘটনার পর সিএমপি পুরো নগরীকে ১০ ভাগে ভাগ করে অপারেশন এস-ড্রাইভ শুরু করে। এরপর থেকে ১০ দিনে কয়েকশ অপরাধীকে গ্রেফতার করা হয়। এসব গ্রেফতারদের মধ্যে ছিল মাদক ব্যবসায়ী, ছিনতাইকারী, কিশোর গ্যাং সদস্য। উদ্ধার করা হয়েছে বিদেশি পিস্তল, গোলাবারুদ ও ইয়াবা। তবে শিল্পপতির বাসায় গুলিবর্ষণকারী সাজ্জাদের সহযোগীদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া না পাওয়ায় বেশ হতাশ ছিল সিএমপি। এর মধ্যেই তারা পেয়ে গেলে সাজ্জাদের অনুসারী কয়েকজন ভয়ংকর সন্ত্রাসীর তথ্য। সাজ্জাদ বাহিনীতে কাজ করতে হলে ধর্মগ্রন্থ ছুঁয়ে শপথ নিতে হয় : পুলিশ জানিয়েছে, বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খানের বাহিনীতে কাজ করতে হলে পবিত্র কুরআন কিংবা অন্য ধর্মগ্রন্থ ছুঁয়ে শপথ নিতে হয়। শপথের সেই ভিডিও বিদেশে অবস্থানরত সাজ্জাদের কাছে পাঠিয়ে অনুমোদন নেওয়া হতো। অপারেশন এস-ড্রাইভে রিমনের কাছ থেকে উদ্ধার করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, নতুন সদস্যরা কুরআন হাতে নিয়ে সাজ্জাদ বাহিনীর প্রতি আনুগত্যের শপথ নিচ্ছেন। ভিডিওতে এক যুবককে বলতে শোনা যায়-‘জীবন-মরণ যাই হোক, সাজ্জাদ ভাইয়ের সঙ্গে কোনো বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে না।’ নিরাপত্তাজনিত কারণে ভিডিওতে থাকা ব্যক্তির মুখ ঝাপসা করা ছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। তার পরিচয়ও গোপন রাখা হয়েছে। এখনও অধরা যেসব সন্ত্রাসী : জানা গেছে, সাজ্জাদের বাহিনীতে ২০ থেকে ২২ জন ভয়ংকর সন্ত্রাসী রয়েছে। তাদের মধ্যে ছোট সাজ্জাদ, রায়হান, বোরহান উদ্দিন, নেজাম উদ্দিন, আলাউদ্দিন, মোবারক হোসেন ওরফে ইমন, হেলাল ওরফে মাছ হেলাল প্রমুখ। সাজ্জাদের সেকেন্ড ইন কমান্ড ছোট সাজ্জাদ গ্রেফতার হওয়ার পর এখন সন্ত্রাসে নেতৃত্ব দিচ্ছে রায়হান। প্রতিদ্বন্দ্বী সরওয়ার বাবলাকে বিএনপি প্রার্থীর গণসংযোগে গুলি করে হত্যা করা হয় এই রায়হানের নেতৃত্বে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অন্তত ১০টি হত্যাকাণ্ডে এই বাহিনী জড়িত বলে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ এলাকা ও ৫ থানার কয়েক লাখ মানুষ বড় সাজ্জাদ বাহিনীর অব্যাহত খুন, চাঁদাবাজির কারণে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছিলেন। সিএমপি ও জেলা পুলিশও বিব্রত ছিল। চট্টগ্রামে শিল্পপতি মুস্তাফিজুর রহমান ও মুজিবুর রহমানের বাসায় প্রকাশ্যে গুলিবর্ষণের ঘটনায় প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। |