|
টেকসই উন্নয়ন এবং নাগরিকের জীবনমান
রায়হান আহমেদ তপাদার:
|
আজকের বিশ্বে উন্নয়নের মানদণ্ড নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আমাদের চোখ যায় জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচীর দিকে। তারা যে ধারণাটি সামনে এনেছে মানব উন্নয়ন সূচক,তা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, উন্নতি কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়; এটি মানুষের সামগ্রিক বিকাশের প্রশ্ন। এইচডিআই তিনটি মূল সূচকের উপর দাঁড়িয়ে: গড় আয়ু, শিক্ষা ও মাথাপিছু আয়। অর্থাৎ মানুষ কতদিন বাঁচছে, কতটা শিক্ষিত হচ্ছে এবং তার জীবনযাত্রার মান কেমন-এই তিনটি প্রশ্নের উত্তরেই লুকিয়ে আছে উন্নয়নের প্রকৃত চিত্র। উন্নয়ন যখন কেবল কলমে কাগজে সীমাবদ্ধ থাকে, তখন তাকে কর্মহীন প্রবৃদ্ধি বা বৈষম্যমূলক উন্নয়ন বলা হয়। আধুনিক অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রকৃত উন্নয়ন হলো মানুষের সক্ষমতার বিকাশ। দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নের প্রধান সূচক হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে জিডিপি। অর্থনীতির পাঠ্যপুস্তক থেকে শুরু করে রাজনৈতিক বক্তৃতা পর্যন্ত, জিডিপি যেন উন্নয়নের সমার্থক শব্দ। একটি দেশের জিডিপি বাড়ছে মানেই দেশ এগোচ্ছে-এমন ধারণাই বহুদিন ধরে আমাদের মানসে প্রতিষ্ঠিত। উৎপাদন বেড়েছে মানেই অর্থনীতি এগিয়েছে- এমন ধারণা নীতিনির্ধারণের কেন্দ্র ছিল। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, জিডিপি বাড়লেই সবার জীবন ভালো হয় না। আয় বাড়তে পারে কিন্তু সেই আয় কার কাছে যাচ্ছে? কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে কি? শিক্ষার মান উন্নত হচ্ছে কি? স্বাস্থ্যসেবা কি হাতের নাগালের মধ্যে আসছে?প্রশ্ন উঠতে পারে,বর্তমান সরকার কি মানুষের জন্য কাজ করবে? উন্নয়নের সুফল কি সবার ঘরে পৌঁছাবে? তরুণদের স্বপ্ন কি বাস্তবে রূপ নেবে? তবে উন্নয়নের আসল মানদণ্ড হলো মানুষের হাসি, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সম্ভাবনার বিকাশ। নির্বাচনের পর নতুন সরকার যদি উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে মানুষকে স্থাপন করতে পারে ঐউও-র মতো সূচককে গুরুত্ব দেয়, আয়-বৈষম্য কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, তরুণদের জন্য ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে তবেই প্রকৃত অর্থে উন্নয়ন সম্ভব। কিন্ত প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশ কি শুধু মেট্রো রেলে চড়ে, পদ্মা সেতু পেরিয়ে আর বাইরের আলোতে ঝলমল করা উন্নয়নের তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে থাকবে, নাকি এমন এক সমাজ গড়বে, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের দক্ষতা ও জীবনমান সত্যিকার অর্থে বিশ্বমানের হবে? আমাদের সমস্যা আদৌ জটিল নয়, এটি আমাদের আত্মসন্তুষ্টি, অসংখ্য বিচ্ছিন্ন ও অদূরদর্শী পরিকল্পনা এবং সনদপত্রের প্রতি অন্ধবিশ্বাসের বিষাক্ত ফসল। দক্ষতার চেয়ে সার্টিফিকেটকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার এই মানসিকতা না বদলালে আমরা চিরকাল এক অভিশপ্ত মধ্যম আয়ের ফাঁদে আটকে থাকব, যেখানে প্রবৃদ্ধির সংখ্যা হয়তো বা চোখ ধাঁধাবে, কিন্তু মানুষের জীবন বদলাবে না। দক্ষিণ কোরিয়ার পার্ক চুং-হি মডেলের দিকে যদি তাকাই, পার্ক শুধু কারখানা বানাননি। তিনি বুঝেছিলেন, শিল্পের জন্য সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো শিল্পোপযোগী মানুষ। তাই কোরিয়ার রূপান্তরের মূলে ছিল প্রযুক্তিগত শিক্ষা, পলিটেকনিকের বিস্তার এবং শিল্প-শিক্ষার লৌহ-দৃঢ় সংযোগ। তাদের লক্ষ্য ছিল ডিগ্রির ফুলঝুরি নয়, বাস্তব ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কফোর্স তৈরি করা। ফলে তাদের শ্রমশক্তি নিম্নমূল্যের উৎপাদন থেকে উচ্চমূল্যের প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে উত্তরণ ঘটিয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি, সীমিত শিল্পভিত্তি ও বিশাল জনসংখ্যা দ্রুত কর্মসংস্থানের দাবি করেছিল। জিয়াউর রহমানের যুগে বাজারমুখী নীতি, বেসরকারি উদ্যোগ, গ্রামীণ অর্থনীতি ও প্রবাসী রেমিট্যান্সের ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল-সেই সময়ের জন্য যা যৌক্তিক ছিল। কিন্তু সেই কর্মসংস্থানকে উচ্চ দক্ষতায় রূপান্তরের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো কখনোই তৈরি করা হয়নি। ঠিক এখানেই কোরিয়া ও বাংলাদেশের পথ আলাদা হয়ে গেছে। কোরিয়া কর্মসংস্থানকে দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করেছিল, আমরা শুধু সংখ্যা বাড়িয়েছি, দক্ষতা তৈরি করিনি। এ কারণে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক খাতে বিপুল সস্তা অর্ডার পায়-চোখ-ধাঁধানো সংখ্যা, কিন্তু তা স্বল্পমূল্যের, সীমিত লাভের। জনশক্তি রপ্তানিতেও আমরা অদক্ষ ও স্বল্পদক্ষ শ্রমিক পাঠাই। গড় রেমিট্যান্স প্রতি মাসে প্রতি কর্মীর জন্য মাত্র ২০৩ ডলার, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন। এটি লজ্জাজনক ব্যর্থতা। তথ্যগত বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের জিডিপির অর্ধেকের বেশি আসে সার্ভিস খাত থেকে; শিল্পের অবদান প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এবং কৃষির অবদান প্রায় ১১-১২ শতাংশ। অর্থাৎ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি এখন শিল্প ও সেবা খাত। জিডিপির প্রায় ৮৩ শতাংশ শিল্প ও সেবা এই দুটি খাত থেকে এলেও ওই দুটি খাতের প্রতিটি উপখাতের মূল পরিচালন বিভাগগুলোর জন্য স্পষ্ট। সরকার গঠিত আমলাতান্ত্রিক কাঠামোতে পরিচালিত এনএসডিসি এই উপখাতগুলোর উন্নয়নে রত হলেও এখনো এই ইন্ডাস্ট্রি-স্পেসিফিক স্কিল আর্কিটেকচারের কার্যকর উত্তর দিতে পারেনি। এই উত্তরহীনতা বাংলাদেশের জন্য আদৌ সুসংবাদ নয়। কেননা ওষুধশিল্পের মার্কেটিং ও চামড়া শিল্পের মার্কেটিং একই ধরনের নয়। মানবসম্পদ তখনই মূল্যবান, যখন দক্ষতায় রূপান্তরিত হয়, দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষা‑শিল্প সংযুক্তি এই বাস্তবতাই প্রমাণ করে। আর সেই বাস্তবতাকে মাথায় রেখেই ইন্ডাস্ট্রি-পেশাজীবী- একাডেমিয়া এবং সরকারের সমন্বয়ে ন্যাশনাল স্কিল আইডেন্টিফিকেশন কমিটি (এনএসআইসি) গঠন করতে হবে, যা আমলাকেন্দ্রিক হবে না, বরং উদ্যোক্তা-পেশাজীবী-একাডেমিয়া নির্ভর হবে এবং দায়বদ্ধ থাকবে সরকারপ্রধানের কাছে। আগের ব্যর্থতার কথা মাথায় রেখে এনএসডিসিকে বাংলাদেশের স্বার্থেই শুধু সমন্বয়কের ভূমিকায় রাখতে হবে। এনএসডিসি শুধু নীতি সহায়তা দেবে, কিন্তু এনএসডিবির হাতে থাকবে বাস্তবায়নের ক্ষমতা, বাজেট ব্যয়ের স্বাধীনতা এবং জবাবদিহি সরকারপ্রধানের কাছে। এই ভারসাম্য না এলে আমাদের দক্ষতা উন্নয়ন চিরকাল অন্ধকারেই থেকে যাবে। বাস্তবায়নকারী হিসেবে এনএসডিবিকে আন্তর্জাতিক মানের কারিকুলাম ও সার্টিফিকেট সুনিশ্চিত করতে হবে, যা বিদেশে গিয়ে ছাত্রদের অথই জলে ফেলবে না। তাহলেই রেমিট্যান্স টেকসইভাবে বাড়বে। এ জন্য ত্রিস্তরীয় কর্মকৌশল জরুরি। চীন সরকারকে নিয়ে বাংলাদেশ একটি নতুন যাত্রা শুরু করতে পারে। নতুন প্রশিক্ষণকেন্দ্র, যেখানে কর্মীরা শিখবে অগ্রসরমাণ যন্ত্রপাতি ব্যবহার, ডিজিটাল দক্ষতা ও স্মার্ট শিল্পায়ন। সেখানে চীনাদের করপোরেট অ্যাপ্রেনটিসশিপ মডেল চালু হবে, হাতে-কলমে কাজ শিখবে, কাজে লাগাবে। আর চীনের তিন বছরের ডিজিটাল কর্মী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ৫০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী প্রশিক্ষণ পাবে-তাদের সার্টিফিকেট হবে আন্তর্জাতিক, চাকরি হবে দেশে আর বিদেশে।এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে-সফলতা কি পরীক্ষা পাসের শতাংশ কিংবা সেতু-মেট্রো রেলের সংখ্যা দিয়ে মাপা হবে, নাকি মানুষের দক্ষতাকে প্রধান পাথেয় করে টেকসই উন্নয়নের পথে হাঁটবে বাংলাদেশ? মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্রের আগামী উন্নয়ন প্রতিযোগিতা কিন্তু অবকাঠামোতে নয়, বরং সক্ষম জনগোষ্ঠী দ্বারাই নির্ধারিত হবে। পরিসংখ্যানের ভাষা সাধারণ মানুষের জন্য প্রায়ই দুর্বোধ্য। ফলে তখন রাজনৈতিক ভাষ্যই অনেক সময় চূড়ান্ত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। অথচ গণতান্ত্রিক সমাজে সংখ্যার স্বচ্ছতা ও স্বাধীন পর্যালোচনা অন্তত জরুরি। অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো-উন্নয়নের সুফল সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছায় না। শহরের ঝলমলে অট্টালিকার পাশে বস্তির শিশু অপুষ্টিতে ভোগে। একদিকে বিলাসবহুল হাসপাতাল অন্যদিকে গ্রামীণ ক্লিনিকে চিকিৎসার অভাব। আয় বৈষম্য বাড়লে সমাজে অসন্তোষ, নিরাপত্তা ও অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যায়। নিম্নআয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমলে অভ্যন্তরীণ বাজার সঙ্কুচিত হয়। শিক্ষায় বিনিয়োগ না করতে পারলে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি হয় না। প্রজন্মগত দারিদ্র্য স্থায়ী হয়ে যায়। অর্থাৎ স্বল্পমেয়াদে প্রবৃদ্ধি থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ে। গণতন্ত্রের ভিত দুর্বল হয়। নির্বাচনের পর তাই সরকারের অন্যতম দায়িত্ব হওয়া উচিত ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করা, কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বিস্তার, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহায়তা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা। শুধু প্রবৃদ্ধি নয়, প্রবৃদ্ধির বণ্টন-এই দৃষ্টিভঙ্গিই মানুষের উন্নয়নের মূল কথা। বাংলাদেশের একটা বড় অংশই তরুণ। এই জনমিতিক সুবিধা সঠিকভাবে কাজে লাগানো গেলে তা দেশের জন্য আশীর্বাদ হতে পারে। কিন্তু শিক্ষা ব্যবস্থা যদি যুগোপযুগী না হয়, দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ সীমিত থাকে, আর কর্মসংস্থান পর্যাপ্ত না হয় তবে এই সম্ভাবনা বোঝায় পরিণত হতে পারে। নির্বাচনের সময় তরুণদের নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকে-স্টার্টআপ সহায়তা, প্রযুক্তি শিক্ষা, কর্মসংস্থান, উদ্ভাবনের সুযোগ।কিন্তু নির্বাচনের পর প্রশ্ন হলো,এই প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবে কতটা রূপ পায়? তরুণদের কেবল কর্মী হিসাবে নয়, চিন্তাশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা জরুরি। তাদের অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি, নীতি প্রণয়নে মতামত দেওয়ার সুযোগ এবং মুক্ত চিন্তার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ মানুষের উন্নয়ন মানে ভবিষ্যত প্রজন্মের সম্ভাবনাকে সুরক্ষিত করা।একটি জাতির শক্তি নির্ভর করে তার মানুষের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের ওপর। উন্নত অবকাঠামো অর্থহীন, যদি অসুস্থ মানুষ ও মানুষ অশিক্ষিত থাকে। স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ বাড়ানো, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, মাতৃ ও শিশু মৃত্যুহার কমানো-এসবই মানব উন্নয়নের অপরিহার্য উপাদান। একইভাবে শিক্ষার মানোন্নয়ন, গবেষণায় উৎসাহ, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং নৈতিক মূল্যবোধের চর্চা জরুরি। নতুন সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত এই দুই খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা। মনে রাখতেই হবে,উন্নয়নের আসল মানদণ্ড হলো মানুষের হাসি, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সম্ভাবনার বিকাশ। লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক, লন্ডন থেকে |