|
৬ লাখ মানুষের জন্য মাত্র ১৫০ পুলিশ, অপরিকল্পিত নগরায়ণে বাড়ছে অপরাধ
নতুন বার্তা, ঢাকা:
|
মোহাম্মদপুর রাজধানী ঢাকার আলোচিত একটি জনপদ। গত ৪৫ বছরে অপরিকল্পিত অবকাঠামোর কারণে বদলে গেছে এখানকার চিত্র। রাজউকের অনুমোদন ছাড়াই একের পর এক হাউজিং প্রকল্প গড়ে উঠছে। কিন্তু এসব দেখেও যেন কেউ বাধা দিচ্ছে না। মোহাম্মদপুরে অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে এখানকার অনিয়ন্ত্রিত ঘনবসতিকে দায়ী করছেন পরিকল্পনাবিদরা।আশির দশকের মোহাম্মদপুর, ঢাকার বুকে সময়ের হাত ধরে বদলে যাওয়া এক আলোচিত জনপদ। যেখানে জনাকীর্ণ জীবন আর এলোপাতাড়ি বসতির মাঝে জননিরাপত্তা এখন অনেকটাই দুরূহ। ফলে দিনে-দুপুরে ডাকাতি, ছিনতাই ও হত্যার মতো অপরাধের শিকার হওয়া এখানে এক নির্মম বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, রাত হলে আমরা বাইরে বের হতে একটু ভয় পাই, অন্তত গলির রাস্তাগুলো এড়িয়ে চলি। এমনকি দিনের বেলাতেও অনেক জায়গায় চুরি, ছিনতাই এসব হয়। পুলিশকে ফোন দিলেও তেমন কোনো উপকার হয় না, তারা দেরিতে আসে। অথচ ৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই এলাকায় ছয় লাখের বেশি মানুষের নিরাপত্তায় আছে মাত্র দেড়শো পুলিশ সদস্য। মোহাম্মদপুর থানার ওসি মেজবাহ উদ্দিন বলেন, এখানে সব ধরনের অপরাধের মূল কেন্দ্রবিন্দু আসলে বস্তিকেন্দ্রিক। আর বড় সমস্যা হলো আমাদের জনবল সংকট। আমরা প্রতিনিয়ত চেষ্টা করছি। সীমিত জনবলকে সুষমভাবে বণ্টনের মাধ্যমে আমরা কাজ করছি। দিনে-রাতে মোবাইল টিমের মাধ্যমে পুরো এলাকা কাভার করার চেষ্টা করছি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মোহাম্মদপুরে তৈরি হয়েছে বেশ কয়েকটি আবাসিক এলাকা, যেমন বসিলা গার্ডেন সিটি, কাদেরাবাদ হাউজিং, ঢাকা উদ্যান ও চাঁদ উদ্যান। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব জায়গাতেই অপরাধীদের আনাগোনা বেশি। অথচ শত শত বহুতল ভবন নির্মাণ করা হলেও হাউজিং কোম্পানিগুলো নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলেনি। মোহাম্মদী হাউজিং লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক ইমরান কাজল বলেন, সামাজিকভাবে রেসপনসিবল প্রতিনিধি থানা, র্যাব, এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি এদের নিয়ে কোনো কার্যকর প্ল্যাটফর্ম নেই। হাউজিং যেহেতু ভূমি নিয়েই ব্যবসা, তাই ভূমি নিয়ে দ্বন্দ্ব আগে থেকেই চলে আসছে। যদিও ঢাকার বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় বাসিন্দাদের উদ্যোগে নেয়া হয়েছে নিরাপত্তামূলক নানা ব্যবস্থা। যেমন গুলশান সোসাইটি দেড় হাজার সিসি ক্যামেরা স্থাপন করেছে। এছাড়া রাতে পাহারার জন্য রয়েছে নিজস্ব টহল টিম। গুলশান সোসাইটির সভাপতি ওমর সাদাত বলেন, বাসিন্দাদের নিজস্ব অর্থায়নে স্থাপিত সিসিটিভি ক্যামেরা প্রতিটি রাস্তায় আছে। ফলে কোনো অপরাধ ঘটলে আমরা দ্রুত শনাক্ত করতে পারি। ক্যামেরার কারণে মানুষ বুঝে যায় এখানে চুরি করা কঠিন। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বলছে, অনুমোদন ছাড়াই মোহাম্মদপুরে বহু হাউজিং গড়ে উঠেছে। আর ডিএনসিসি প্রশাসকের মতে, নগরীর সব সেবাসংস্থা একক নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত না হলে সমস্যার সমাধান কঠিন। রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, এই হাউজিংগুলোর কোনো অনুমোদন নেই। এসব জায়গায় আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি, মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছি, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করছি। কিন্তু কিছুদিন পর আবার অবৈধভাবে কার্যক্রম শুরু হয়ে যাচ্ছে। ডিএনসিসি প্রশাসক শফিকুল ইসলাম বলেন, এটা অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। সিটি কর্পোরেশনের দায় নেই, এ কথা বলা যাবে না, অবশ্যই দায়িত্ব আছে। তবে সব সেবা সংস্থা যদি এক ছাতার নিচে না আসে, তাহলে সমন্বিতভাবে কাজ করা কঠিন হয়ে যাবে। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, জনজীবন নিরাপদ করতে হলে পুরো শহরকে এক দৃষ্টিতে দেখতে হবে। গুলশান-গুলিস্তান কিংবা মিরপুর-মোহাম্মদপুরে বৈষম্য না করে একই পরিকল্পনায় নগর সাজাতে হবে। নগর পরিকল্পনাবিদ আদিলুর রহমান বলেন, যখন অভিযান চালানো হয়, অনেক সময় তা একপেশে বা মৌসুমি হয়। রাষ্ট্র চাইলে পুরো মোহাম্মদপুর এলাকাকে অপরাধমুক্ত করা সম্ভব, তবে এর জন্য কমিউনিটি সংযোগ দরকার। এলাকাভিত্তিক সামাজিক সম্পৃক্ততা তৈরি করতে হবে। তিনি আরও বলেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে ঢাকার ভেতরে নতুন কোনো আবাসিক প্রকল্প যেন গড়ে না ওঠে, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। |