|
সরকারি ল্যাবের সীমাবদ্ধতা ও দীর্ঘসূত্রতায় বাড়ে আমদানি ব্যয়
বন্দরে পণ্য খালাসে গতি আনতে বেসরকারি ল্যাবের দ্বার খুলছে
আন্তর্জাতিক মান পূরণ করলেই মিলবে বেসরকারি ল্যাবে পরীক্ষার স্বীকৃতি
নতুন বার্তা, ঢাকা:
|
দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর। এই বন্দরের মাধ্যমে বাংলাদেশের মোট আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ সম্পন্ন হয়। এছাড়া, দেশের ২৪টি স্থলবন্দর, ৩টি আন্তর্জাতিক কার্গো বিমানবন্দর এবং অন্যান্য নৌবন্দর মিলিয়ে প্রায় ৩১টি প্রবেশপথ দিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিচালিত হচ্ছে।তবে, আমদানিপণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা, কনটেইনার জট এবং অতিরিক্ত ব্যয় নিয়ে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে ওষুধের কাঁচামাল, খাদ্যপণ্য, রাসায়নিক, প্রসাধনী, সার ও বিভিন্ন শিল্প কাঁচামালের ক্ষেত্রে মান পরীক্ষা ও গুণগত সনদ পেতে বিলম্ব হওয়ায় পণ্য খালাস প্রক্রিয়া আটকে যায়। নমুনা পরীক্ষার প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত কাস্টমস ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো ছাড়পত্র দেয় না। ফলে দিনের পর দিন কনটেইনার বন্দরে পড়ে থাকে; এতে ডেমারেজ, স্টোরেজ ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় ক্রমাগত বাড়তে থাকে। ব্যবসায়ীদের দাবি, বর্তমানে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সরকারি পরীক্ষাগারের প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু সীমিত সক্ষমতা, যন্ত্রপাতির সংকট এবং নমুনার অতিরিক্ত চাপের কারণে পরীক্ষার ফলাফল পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। এতে শুধু ব্যবসার খরচই বাড়ে না, বন্দর ও টার্মিনালে কনটেইনার জটও তীব্র আকার ধারণ করে। এমন বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ও স্বীকৃত বেসরকারি পরীক্ষাগারের (ল্যাবরেটরি) সনদ গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি পরীক্ষাগারের পাশাপাশি নির্দিষ্ট মানদণ্ড পূরণকারী বেসরকারি ল্যাবরেটরির পরীক্ষার প্রতিবেদন গ্রহণের বিধান যুক্ত হতে পারে। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে বন্দরের জট কমবে, পণ্য খালাস দ্রুত হবে এবং ব্যবসার ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বাজেট সংশ্লিষ্ট একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, বর্তমানে খাদ্যপণ্য, রাসায়নিক, ওষুধের কাঁচামাল, ভোজ্যতেল, সার, প্রসাধনী, বৈদ্যুতিক পণ্যসহ বহু ধরনের আমদানিপণ্য খালাসের আগে মান পরীক্ষা বা গুণগত সনদ বাধ্যতামূলক। এসব ক্ষেত্রে নমুনা সংগ্রহ করে সরকারি পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়। পরীক্ষার প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত পণ্য ছাড় হয় না। ফলে কনটেইনার দিনের পর দিন বন্দরে পড়ে থাকে। ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের দাবি বিবেচনা করে আগামী বাজেটে সরকারি পাশাপাশি বেসরকারি ল্যাবরেটরির রিপোর্টও আমলে নেওয়ার সুযোগ রাখা হচ্ছে। তবে, সে ক্ষেত্রে ল্যাবরেটরিটিকে অবশ্যই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও নির্দিষ্ট মানদণ্ডের হতে হবে। বন্দর থেকে পণ্য খালাসের বর্তমান পদ্ধতি ও জটিলতা আমদানিকারক দেশে পণ্য আনার পর বন্দরে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কাছে প্রথমে ‘বিল অব এন্ট্রি’ দাখিল করেন। এরপর কাস্টমস ঝুঁকি মূল্যায়ন করে পণ্য পরীক্ষার প্রয়োজন আছে কি না, তা নির্ধারণ করে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে কেবল নথিপত্র যাচাই করেই পণ্য ছাড়পত্র দেওয়া হয়। তবে খাদ্য, রাসায়নিক, কৃষিপণ্য, ওষুধ, প্রসাধনী, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও শিল্প কাঁচামালের ক্ষেত্রে পরীক্ষাগারের সনদ আবশ্যক। সে ক্ষেত্রে পণ্যের নমুনা সংগ্রহ করে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই), ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর, বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর), উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্র কিংবা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়। ল্যাব রিপোর্ট পাওয়ার পর কাস্টমস কর্তৃপক্ষ পণ্য ছাড়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এই পরীক্ষার রিপোর্ট পেতেই কয়েক সপ্তাহ বা মাস পেরিয়ে যায়। এই দীর্ঘ সময়ে পণ্যভর্তি কনটেইনার বন্দরে আটকে থাকায় আমদানিকারককে ডেমারেজ, স্টোরেজ চার্জ, কনটেইনার ভাড়া ও ব্যাংক সুদ গুনতে হয়, যা পণ্যের আমদানি ব্যয় অনেক বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে দ্রুত পচনশীল খাদ্যপণ্য বা শিল্পকারখানার জরুরি কাঁচামালের ক্ষেত্রে এই বিলম্ব উৎপাদন কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। একটি কনটেইনার যদি ১০ দিন বন্দরে পড়ে থাকে, তবে শুধু ডেমারেজ ও স্টোরেজ বাবদ কয়েক হাজার থেকে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয় হয়। বেসরকারি ল্যাবের মাধ্যমে পরীক্ষার রিপোর্ট দ্রুত পাওয়া গেলে এই খরচ অনেকটাই কমানো সম্ভব। অবশ্য কাস্টমস সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, বেসরকারি ল্যাবকে সুযোগ দেওয়ার আগে কঠোর স্বীকৃতি, নিয়মিত অডিট, মান নিয়ন্ত্রণ এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায়, ভুল বা পক্ষপাতদুষ্ট পরীক্ষার ঝুঁকি থেকে যেতে পারে। সম্প্রতি অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এক আলোচনা সভায় বেসরকারি ল্যাবরেটরির বিষয়ে বলেন, ‘চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা আমাকে জানিয়েছেন যে, তাদের এমন কিছু পণ্য আছে যেগুলো পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠাতে হয়, কারণ পরীক্ষাগারগুলো সব ঢাকাতেই অবস্থিত। পণ্য পাঠানো এবং পরীক্ষা শেষ হতে হতে অনেক দিন পার হয়ে যায়। এই দীর্ঘ সময়ে ব্যবসায়ীদের মালামাল বন্দরেই পড়ে থাকে, যার ফলে প্রতিদিন তাদের বিপুল পরিমাণ অর্থ লোকসান করতে হয়। বন্দর ব্যবহারের মাশুল, ব্যাংকের খরচ এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয়ের কারণে তাদের এই ক্ষতি বাড়তেই থাকে। অন্যদিকে, কাঁচামাল বা প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাবে শিল্পকারখানাগুলোও অচল হয়ে বসে থাকে। মন্ত্রী আরও বলেন, পরীক্ষা করার এই দায়িত্ব বাণিজ্য সংগঠনগুলো নিজেরা পরিচালনা করতে পারবে কি না, জানতে চাইলে তারা ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন। আমি এনবিআর চেয়ারম্যানকে ফোনে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার জন্য বলেছি। জেটি-টার্মিনাল পরিচালনায় বেসরকারি খাত, আসছে নতুন নীতিমালা বর্তমানে দেশের প্রায় ৯৩ শতাংশ বৈদেশিক বাণিজ্য সমুদ্রবন্দরনির্ভর। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের বন্দরগুলো প্রায় ৩০ লাখ টিইইউ কনটেইনার, ১০ কোটি ৫০ লাখ টন কার্গো এবং প্রায় সাড়ে ৪ হাজার জাহাজ হ্যান্ডলিং করেছে। ভবিষ্যতে শিল্পায়ন ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের ফলে এই চাপ আরও বাড়বে। তাই সরকারি বিনিয়োগের পাশাপাশি বেসরকারি পুঁজি আকর্ষণের মাধ্যমে নতুন জেটি ও টার্মিনাল গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে সরকার। ইতোমধ্যে বেসরকারি পর্যায়ে টার্মিনাল অপারেটররা কাজও শুরু করেছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন বাজেটে বেসরকারি পর্যায়ে জেটি-টার্মিনাল পরিচালনার জন্য একটি নীতিমালা চূড়ান্ত করা হচ্ছে, যার নাম হবে— ‘প্রাইভেট জেটি অ্যান্ড টার্মিনাল কনস্ট্রাকশন, অপারেশন ও ম্যানেজমেন্ট পলিসি-২০২৬’। প্রস্তাবিত নীতিমালার উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হলো— নিজস্ব অর্থায়নে নির্মাণ: সরকারি বা বেসরকারি মালিকানাধীন জমিতে, বন্দর এলাকার ভেতরে বা অনুমোদিত স্থানে বেসরকারি উদ্যোক্তারা নিজস্ব অর্থায়নে জেটি ও টার্মিনাল নির্মাণ, পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার সুযোগ পাবেন। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার: কার্গো ওঠানো-নামানো, সংরক্ষণ ও হ্যান্ডলিংয়ে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে, যাতে সময়, খরচ ও মানবিক জটিলতা হ্রাস পায়। অবকাঠামো সুবিধা: বেসরকারি টার্মিনাল অপারেটরকে কাস্টমস কর্মকর্তাদের দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও অফিস সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। ট্যারিফ নির্ধারণ: জেটি বা টার্মিনালে পণ্য ওঠানো-নামানো, সংরক্ষণ ও হ্যান্ডলিং চার্জ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নিজেরা নির্ধারণ করতে পারবে না; এটি সংশ্লিষ্ট বন্দর কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করবে। রাজস্ব ভাগাভাগি: টার্মিনাল থেকে অর্জিত আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ বন্দর কর্তৃপক্ষ পাবে। এই উদ্দেশ্যে অপারেটর ও বন্দর কর্তৃপক্ষের মধ্যে একটি পৃথক রাজস্ব ভাগাভাগি (রেভিনিউ শেয়ারিং) চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। |